পদার্থবিজ্ঞানের এবং তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশলের দৃষ্টিকোন থেকে তড়িৎ কি ?

Posted by

পদার্থবিজ্ঞানের এবং তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশলের দৃষ্টিকোন থেকে তড়িৎ পরিবাহী বা বিদ্যুৎ পরিবাহী বা তড়িৎ পরিবাহক হলো সেই বস্তু যার মধ্য দিয়ে খুব সহজেই অর্থাৎ খুব অল্প বাধায় বা রোধে তড়িৎ বা বিদ্যুৎ চলাচল করতে পারে। প্রধানত ধাতব পদার্থগুলো যেমন তামা বা রূপা ইত্যাদির তড়িৎ পরিবাহিতা খুব ভালো হয় কারণ এদের পরমাণুর গঠন অনুযায়ী সর্ব বহিঃস্থ খোলকে একটি করে ইলেকট্রন থাকে যা খুব সহজেই বা অল্প প্রণোদনাতেই ঐ পরিবাহীর পরমাণু থেকে পরমাণুতে চলাচল করতে পারে। যেহেতু তড়িৎ প্রবাহ হচ্ছে আসলে চার্জ যুক্ত আধানের প্রবাহ তাই এই সহজে চলাচলে সক্ষম ইলেকট্রন খুব সহজে পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহে সহায়তা করে। ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রনই শুধু নয়, স্ফটিক সজ্জার মধ্য দিয়ে ধনাত্মক আধানও পরমাণুর আকারে প্রবাহিত হতে পারে যেটা ইলেকট্রন হোল নামে পরিচিত। আবার তড়িৎ কোষের (battery) মধ্যে দিয়ে আয়নের আকারেও আধান প্রবাহিত হতে পারে। এই সকল ধরণের আধানের প্রবাহই তড়িৎ প্রবাহ, তাই যার মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হতে পারে তাকে তড়িৎ পরিবাহী বলা যায়। কিন্তু সাধারণভাবে তড়িৎ পরিবাহী বলতে ইলেকট্রন প্রবাহ করতে সক্ষম পদার্থকেই বোঝায়। দৈনন্দিন জীবনে বিদ্যুৎ পরিবহনকারী তারকে বিদ্যুৎ পরিবাহীর প্রতিশব্দ হিসেবেও দেখা হয়।

poromanu.com
তড়িৎ পরিবাহী তারের মাধ্যমে দূর দূরান্তে তড়িৎ বা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়

প্রকারভেদ=====
তড়িৎ পরিবাহী পদার্থসমূহকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়: সুপরিবাহী, অর্ধপরিবাহী, কুপরিবাহী।

সুপরিবাহী: যে বস্তুর মধ্য দিয়ে বিদ্যুত সহজেই প্রবাহিত হতে পারে বা চলাচল করতে পারে, তাকে সুপরিবাহী বলে। যেমন: লোহা, তামা, রূপা, সোনা ইত্যাদি।
অর্ধপরিবাহী: যে বস্তুর মধ্য দিয়ে নির্ধারিত মাত্রার বিদ্যুত প্রবাহিত হতে পারে তাকে অর্ধপরিবাহী বলে। যেমন: সিলিকন, জার্মেনিয়াম ইত্যাদি। তাপমাত্রা বৃদ্ধি করলে এদের পরিবাহিতা একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত দ্রুত হারে বৃদ্ধি পায়।
অন্তরক: যে বস্তুর মধ্য দিয়ে বিদ্যুত প্রবাহিত হতে পারে না তাকে অন্তরক বা কুপরিবাহী বলে। যেমন: কাঠ, প্লাস্টিক, কাগজ ইত্যাদি।
এছাড়া অতিপরিবাহী একটি বিশেষ প্রকারের পরিবাহী যার রোধ শূণ্য।

রোধ হচ্ছে বিদ্যুৎ পরিবাহীর ধর্ম। বিদ্যুৎ পরিবাহীর যে ধর্মের জন্য এর মধ্য দিয়ে পরিবাহিত তড়িৎ প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয় বা বিঘ্নিত হয়, তাকে রোধ বলে। রোধের এসআই একক ও’ম, একে গ্রীক চিহ্ন ওমেগা (Ω) দ্বারা সূচিত করা হয়। বৈদ্যুতিক যন্ত্রে প্রবাহ নিয়ন্ত্রন করার জন্য রোধ ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট উষ্ণতায় যে কোন পরিবাহীর রোধ এর দৈর্ঘ্যের সমানুপাতিক এবং এর প্রস্থচ্ছেদের ব্যস্তানুপাতিক। অতিপরিবাহী (সুপার কন্ডাক্টর) ছাড়া সব পরিবাহীরই কিছু না কিছু রোধ আছে, তা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন। কোন নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কোন পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য ও এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহের অনুপাত দ্বারা ঐ তাপমাত্রায় ঐ পরিবাহীর রোধ পরিমাপ করা যায়। রোধ পরিমাপের জন্য নিম্নোক্ত সূত্র ব্যবহার করা হয় যা মূলতঃ ও’মের সূত্রের ভিন্নরূপঃ

R=V/1
কোন পরিবাহকের দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য ১ ভোল্ট হলে যদি তার মধ্য দিয়ে ১ অ্যাম্পিয়ার তড়িৎ প্রবাহ প্রবাহিত হয় তবে ঐ পরিবাহীর রোধকে ১ ও’ম বলে।

তুল্য রোধ
কোন বর্তনীতে বিদ্যমান রোধগুলোর পরিবর্তে যে মানের কোন রোধের জন্য বর্তনীতে বিভব এবং তড়িৎ প্রবাহ অপরিবর্তিত থাকে , তাকে ঐ বর্তনীর তুল্য রোধ বলে ।

তুল্য রোধ দুই ধরনের হয়ে থাকে

শ্রেনী(অনুক্রমিক) সমবায়ের তুল্যরোধ
সমান্তরাল সমবায়ের তুল্য রোধ

অন্তরক বা বিদ্যুত কুপরিবাহী পদার্থের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ চলাচল করতে পারে না। এদের পরমাণুর সর্ব বহিঃস্থ খোলকে অবস্থিত ইলেকট্রন মুক্তভাবে চলাচল করতে অপারগ থাকায় বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের উপস্থিতিতে বহিস্থ প্রনোদনা দেয়া হলেও এদের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হতে পারে না। আদর্শ অন্তরক বাস্তবে পাওয়া না গেলেও কিছু পদার্থ যেমন কাচ, শুকনো কাগজ, টেফলন, ইত্যাদির বৈদ্যুতিক রোধ অনেক বেশি থাকায় এরা অন্তরক হিসেবে খুব ভালো কাজ করে। আবার কিছু পদার্থ যেমন প্লাস্টিক বা রাবারের ন্যায় পলিমারের রোধ তুলনামূলকভাবে কম হলেও এরা তড়িৎ পরিবাহী পদার্থের উপরে অন্তরক আবরণ হিসেবে ভালো কাজ করে। এসব পদার্থকে অল্প থেকে মাঝারি ভোল্টে (কয়েক হাজার ভোল্ট পর্যন্ত) অন্তরক হিসেবে নিরাপদে ব্যবহার করা যায়।

বৈদ্যুতিক যন্ত্রে অন্তরক বিপুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়। প্রধানত বিদ্যুৎ পরিবাহী তার বা অংশকে আলাদা রাখতে ও এদেরকে ধরে রাখতে অন্তরক ব্যবহৃত হয়। বিদ্যুৎ সঞ্চালন তারকে পোলের সাথে আটকে রাখতে অন্তরকের ব্যবহার অহরহ চোখে পড়ে।

অতিপরিবাহী বা সুপার-কন্ডাক্টার হল কিছু পদার্থের উপর অতিশৈত্যের প্রভাবে উদ্ভূত এমন পরিবাহী ধর্ম যাতে বিদ্যুত পরিবহনের রোধ শুন্য হয়ে যায়। অর্থাৎ একটি বর্তনী অতিপরিবাহী হলে তার মধ্যে একবার বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে দিলে রোধ জনিত তাপ ক্ষয় না থাকার ফলে, বিদ্যুৎটি কোন নতুন উৎস ছাড়াই বইতেই থাকবে। ১৯১১ সালে বিজ্ঞানী কামারলিং ওনেস অতিশৈত্যে পারদের বৈদ্যুতিক রোধ মাপতে গিয়ে ৪.২ কেলভিন তাপমাত্রায় পারদে এই বিশেষত্ব প্রথম আবিষ্কার করেন। এই বৈশিষ্ট ব্যাখ্যা করা হয় বার্ডিন-কুপার-শ্রিফার তত্ব [Bardeen-Cooper-Schrieffer (BCS) theory] দ্বারা।

কিন্তু অধিকাংশ অতিপরিবাহী কেবল খুব নিম্ন তাপমাত্রায় অতিপরিবাহী থাকে। অতিপরিবাহী পদার্থের বৈশিষ্ট্য হল এর ভিতর থেকে চৌম্বক ক্ষেত্রকে বার করে দেয়। তাই অতি পরিবাহির বিকর্ষণে চুম্বক ভাসতে পারে। এই ভাসান অর্থাৎ লেভিটেশন ব্যবহার করে খুব দ্রুতগামী ট্রেন চালানো হয় যাতে লাইনের সঙ্গে ঘর্ষণ না হয়।

কিছু পদার্থ রয়েছে যেগুলো সাধারণ অতিপরিবাহী গুলি যে তাপমাত্রায় অতিপরিবাহীতা দেখায় তার চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় এই ধর্ম প্রদর্শন করে। এদের উচ্চ তাপমাত্রা অতিপরিবাহী বলা হয়।

এম আর আই (ম্যাগ্নেটিক রেসোনান্স ইমেজিং) মেশিনের চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরির জন্য এত বেশি বিদ্যুত লাগে যে তার রোধ কম করতে অতি পরিবাহী বর্তনী ব্যবহার করতে হয়।

অতিপরিবাহীর উপাদানগত বৈশিষ্ট্য
একটি সাধারণ কন্ডাক্টরের বেলায়, তরিৎ প্রবাহকে একটি বিশালাকার আয়ন ল্যাটিসের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ইলেকট্রন প্রবাহী হিসেবে কল্পনা করা যেতে পারে। ইলেকট্রনগুলো অনবরত ল্যাটিসের আয়নের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, আর এই সংঘর্ষের সময় এই বিদ্যুৎ অর্থাৎ ইলেক্ট্রনের প্রবাহ যে শক্তি বহন করছিল তার কিছু অংশ সেই ল্যাটিস দ্বারা শোষিত হয় আর তাপে পরিণত হয়। এই তাপ হচ্ছে ল্যাটিস আয়নগুলোর মধ্যকার কম্পমান গতিশক্তি। এর ফলে বিদ্যুৎ প্রবাহ যে শক্তি বহন করছিল তা ক্রমাগতভাবে কমতে থাকে। এই ঘটনাটাই হল বৈদ্যুতিক রোধ এবং জুল হিটিং।

অতিপরিবাহী বা সুপারকন্ডাক্টরের বেলায় পরিস্থিতিটি ভিন্ন। একটি সাধারণ সুপারকন্ডাক্টরে ইলেকট্রন প্রবাহী আলাদা আলাদা ইলেকট্রন নিয়ে গঠিত হয় না, বরং এটি গঠিত হয় দুটো ইলেক্ট্রনের জোড়া বা পেয়ার নিয়ে, অর্থাৎ অনেকগুলো ইলেকট্রন জোড়া নিয়েই ইলেকট্রন প্রবাহ তৈরি হয়। এই জোড়াগুলোকে বলা হয় কুপার পেয়ার। এই জোড়াটি যে আকর্ষণ বল নিয়ে গঠিত হয় সেটি আসে ইলেকট্রনগুলোর মধ্যকার ফোননের আদান প্রদানের ফলে। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা অনুসারে বলা যায় এই কুপার পেয়ারের শক্তি বর্ণালী বা এনার্জি স্পেকট্রামে শক্তি পার্থক্য বা এনার্জি গ্যাপ থাকে। এর অর্থ হচ্ছে সেই প্রবাহকে উত্তেজিত করতে একটি সর্বনিম্ন পরিমাণ শক্তি ΔE সরবরাহ করতে হবে। তাই যদি এই ΔE ল্যাটিসের তাপশক্তি kT এর চেয়ে বেশি হয় (এখানে, k হচ্ছে বোলটজম্যান ধ্রুবক, এবং T হচ্ছে এর তাপমাত্রা) তাহলে ল্যাটিসের দ্বারা ইলেকট্রনের প্রবাহ বিক্ষিপ্ত হবে না। এজন্য কুপার পেয়ার প্রবাহ হচ্ছে একটি সুপারফ্লুইড বা অতিপ্রবাহী, অর্থাৎ কোন রকম শক্তির খরচ ছাড়াই এটি প্রবাহিত হতে পারে।

অর্ধপরিবাহী (ইংরেজি: Semiconductor) এক বিশেষ ধরণের পদার্থ যাদের তড়িৎ পরিবাহিতা পরিবাহী (ইংরেজি: Conductor) এবং অন্তরকের (ইংরেজি: Insulator) মাঝামাঝি। সিলিকন, জার্মেনিয়াম, ক্যাডমিয়াম সালফাইড, গ্যালিয়াম আর্সেনাইড ইত্যাদি অর্ধপরিবাহী পদার্থের উদাহরণ। কোন পদার্থ কতটুকু তড়িৎ পরিবহন করতে সক্ষম তা তাদের আপেক্ষিক রোধের মানের ওপর নির্ভর করে। যার আপেক্ষিক রোধ যত বেশি তার পরিবাহিতা তত কম। যেমন, স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কাচের (অন্তরক) আপেক্ষিক রোধ ১০১৬ ওহম-মিটার আর তামার (পরিবাহী) হলো ১০−৮। অর্ধপরিবাহীর আপেক্ষিক রোধের গড় মান এদের মাঝামাঝি (সাধারণত ১০−৫ থেকে ১০৮ এর মধ্যে)।[১]

আধুনিক যুগে প্রযুক্তির প্রভূত অগ্রগতির মূলে রয়েছে এই অর্ধপরিবাহী। কারণ এটি দিয়েই প্রথমে ডায়োড এবং পরবর্তীতে ট্রানজিস্টর নির্মীত হয়। আর এদের হাত ধরেই যাত্রা শুরু হয় আধুনিক ইলেকট্রনিক্স যুগের। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশলে এর বিশাল ভূমিকা রয়েছে। আর বিজ্ঞানের যে শাখায় এ নিয়ে আলোচনা করা হয় তা হল কঠিন অবস্থা পদার্থবিজ্ঞান (সলিড স্টেট)। অর্ধপরিবাহীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, একে উত্তপ্ত করা হলে তড়িৎ পরিবাহিতা বৃদ্ধি পায়। তাই উচ্চ তাপমাত্রায় এটি সুপরিবাহীর মত আচরণ করে। অথচ সুপরিবাহীকে উত্তপ্ত করলে তার পরিবাহিতা কমে যায়। এর সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, কোন বিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহীর সাথে নির্দিষ্ট কোন অপদ্রব্যের খুব সামান্য পরিমাণ (এক কোটি ভাগে এক ভাগ[২]) যোগ করলে তার রোধ অনেকগুণ কমে যায়, ফলতই পরিবাহিতা বেড়ে যায় অনেকগুণ। এভাবে অপদ্রব্য মেশানোর প্রক্রিয়াকে বলে ডোপায়ন। এই ডোপায়নের মাধ্যমেই ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি নির্মাণ করা হয়।

গাঠনিক বৈশিষ্ট্য

সিলিকন পরমাণুর সর্ববহিঃস্থ স্তরে ইলেকট্রনের সমযোজী বন্ধন। কালো বৃত্তগুলো ইলেকট্রন, নীলগুলো পরমাণুর কেন্দ্রিন এবং বাঁকা রেখাগুলো দ্বারা বন্ধন বোঝানো হয়েছে
অর্ধপরিবাহীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ভূমিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, পরিবাহী পদার্থে যেখানে তাপমাত্রা বাড়ালে পরিবাহিতা হ্রাস পায় অর্ধপরিবাহীর ক্ষেত্রে সেখানে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে পরিবাহিতা বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয় সামান্য অপদ্রব্য যোগ করলে এদের পরিবাহিতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি ডোপায়ন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ব্যাখ্যা করা হবে। এখানে অর্ধপরিবাহীর অভ্যন্তরীন গঠন ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে প্রথম বৈশিষ্ট্যটি বিস্তারিত বলা হবে।

পরিবাহী পদার্থের সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তরে একটি, দুটি বা সর্বোচ্চ তিনটি ইলেকট্রন থাকে। বহিঃস্তরের এই ইলেকট্রনগুলো পরমাণু কেন্দ্রের সাথে বেশ দুর্বলভাবে সংযুক্ত থাকে। এই সর্ববহিঃস্থ তথা যোজন স্তরের ইলেকট্রনগুলো অন্য পরমাণুর অসম্পূর্ণ কক্ষপথ পূর্ণ করার জন্য নিজ পরমাণু ছেড়ে চলে যায়। এভাবে আয়নিক বন্ধন গঠিত হয়। এভাবে পরিবাহীর অভ্যন্তরের ইলেকট্রনগুলো এক পরমাণু থেকে আরেক পরমাণুতে ভ্রমণ করতে পারে। আর এ কারণেই এদের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, ইলেকট্রনের প্রবাহই তো আসলে বিদ্যুৎ। মূলত যোজন ইলেকট্রনের স্বাধীন চলাচলেই পরিবহন ঘটে। কিন্তু, অপরিবাহী পদার্থের সর্ববহিঃস্থ শক্তিস্তর ইলেকট্রন দ্বারা প্রায় পূর্ণ থাকে। উল্লেখ্য বহিঃস্থ স্তরে আটটি ইলেকট্রন থাকলে তা সুস্থিতি লাভ করে, আর অপরিবাহীতে আটটি বা এর কাছাকাছি সংখ্যক ইলেকট্রন থাকে। তাই এদের যোজন ইলেকট্রন পরিবহনে অংশ নিতে পারেনা, তারা নিজ নিজ পরমাণুতে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে।

অপরদিকে অর্ধপরিবাহী পদার্থ যেমন জার্মেনিয়াম বা সিলিকন পরমাণুর বাইরের কক্ষে চারটি ইলেকট্রন থাকে। আটটি পূর্ণ করতে হলে তার প্রয়োজন আরও চারটি ইলেকট্রন। তারা বাকি চারটি ইলেকট্রন অর্জন করে আশেপাশের অন্য পরমাণু থেকে। তবে পাশের পরমাণু তাদের ইলেকট্রন একেবারে দিয়ে দেয়না বরং ভাগাভাগি করে। একে অপরের চারটি করে পরমাণু ভাগাভাগি করে। ফলে দুজনেই বহিঃস্থ কক্ষে আটটি করে ইলেকট্রন পায় এবং স্থিতি অর্জন করে। এভাবে তাদের মধ্যে যে বন্ধনের সৃষ্টি হয় তাকে বলে সমযোজী বন্ধন। উল্লেখ্য কিছু পরিবাহী বা অপরিবাহীও সমযোজী বন্ধন তৈরি করতে পারে। এভাবে সমযোজী বন্ধন গঠনের মাধ্যমে জার্মেনিয়াম বা সিলিকন বিশুদ্ধ কেলাস তৈরি করে যাকে কঠিন অবস্থা পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় অন্তর্জাত (intrinsic) কেলাস বলা হয়। এগুলোতে কোন মুক্ত ইলেকট্রন থাকেনা তাই স্বাভাবিক অবস্থায় এরা কোন তড়িৎ পরিবহন করেনা। এ ধরণের বিশুদ্ধ কেলাসের তাপমাত্রা বাড়ালে কিছু কিছু সমযোজী বন্ধন ভেঙে যায় এবং গুটিকতক মুক্ত ইলেকট্রনের সৃষ্টি হয়। এভাবেই উচ্চ তাপমাত্রায় অর্ধপরিবাহী পদার্থ সাধারণ পরিবাহীর মত আচরণ করে।

শক্তি ব্যান্ড এবং বৈদ্যুতিক প্রবাহ
সর্বোত্তম স্ফটিকাকার অর্ধপরিবাহীতে, ইলেকট্রন শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ব্যান্ড মধ্যে শক্তি ধারণ করতে পারে। শক্তিগতভাবে, এই ব্যান্ডের অবস্থান পদার্থের মধ্যে শক্তভাবে যুক্ত ইলেকট্রন এবং মুক্ত ইলেকট্রন শক্তির মাঝামাঝি। শক্তি ব্যান্ডের এক একটি উপাদান পৃথকভাবে স্বতন্ত্র কোয়ান্টাম রাজ্যের অনেকগুলো ইলেকট্রনের সাথে মিলে যায় এবং কম শক্তি সম্পন্ন স্তর (নিউক্লিয়াসের কাছাকাছি অবস্থিত) গুলো থেকে যোজ্যতা ব্যান্ড পর্যন্ত দখল শক্তি দখল করে নেয়। অর্ধপরিবাহী থেকে কুপরিবাহীগুলো থেকে সম্পূর্ণ ভাবে আলাদা কারণ কোনো ধাতু মধ্যে যোজ্যতা ব্যান্ড স্বাভাবিক কার্যকর অবস্থার ইলেকট্রন দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে যেখানে খুব কম সঙ্খক অর্ধপরিবাহী আছে যাদের পরিবহন ব্যান্ডে ইলেকট্রন পাওয়া যায় যা যোজ্যতা ব্যান্ড উপরে।

কতটা স্বচ্ছন্দে সঙ্গে যা অর্ধপরিবাহীর যোজ্যতা ব্যান্ড থেকে পরিবহন ব্যান্ডে উত্তেজিত করা যাবে তা মূলত ব্যান্ডের মধ্যে ব্যান্ড ফাঁক (ব্যান্ড গ্যাপ) উপর নির্ভর করে। যথেচ্ছ ভাবে বিভাজিত সেমি কন্ডাক্টর এবং কুপরিবাহীর লাইন এর মধ্যে শক্তি ব্যান্ড ফাঁক প্রায় 4 eV এর মতো।

সমযোজী বন্ধনের ক্ষেত্রে ইলেকট্রন গুলো প্রতিবেশী বন্ধনের আশায় ঘুরতে থাকে। Pauli বর্জন নীতির জন্য ইলেকট্রনের প্রয়োজন নিজ স্তর থেকে উচ্চতর বিরোধী স্তরে পৌছানো। যেমন এক মাত্রার জন্য একটি ছোট তারে, প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট শক্তির জন্য একটা অবস্থা আছে যার জন্য ইলেকট্রন এক দিক প্রবাহিত হতে দেখা যায় অন্য অবস্থার জন্য ইলেকট্রন অন্য দিকে প্রবাহিত হয়। একটি নেট বর্তমান প্রবাহে জন্য, এক দিকের দিকবিন্যাস অন্য দিকের থেকে বেশি হতে হয়। এটি সম্পাদনের জন্য অর্ধপরিবাহী পরবর্তী উচ্চতর অবস্থা ব্যান্ড ফাঁক শক্তি উপরে থাকা প্রয়োজন হয়। প্রায়ই এটি এটা বলা হয় যে: সম্পূর্ণ ব্যান্ডের তরিত প্রবাহ অবদান রাখে না। তবে, যেহেতু একটি অর্ধপরিবাহী তাপমাত্রা পরম শূন্য উপরে উথানো হয়, সেহেতু অর্ধপরিবাহীর জাফরি ​​কম্পন এবং ইলেকট্রনের পরিবহন ব্যান্ডে উত্তেজিত করার মত যথেষ্ট শক্তি আছে। প্রবাহী ইলেকট্রনগুলকে মুক্ত ইলেকট্রন বলে। উত্তেজিত ইলেকট্রন গুলো পরিবহন ব্যান্ড পিছনে গর্ত ছেড়ে আশে। গর্ত নিজেদের নড়াচড়া করবেন না, কিন্তু একটি প্রতিবেশী ইলেকট্রন থেকে গর্ত ভরাট স্থানান্তর করতে এগিয়ে আশে। গর্ত এই ভাবে এভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে আসে এবং এদের আচরণ ধনাত্তক আধানের মত। এক কঠিন মধ্যে প্রতিবেশী পরমাণু মধ্যে সমযোজী বন্ড হল পরমাণু একক ইলেকট্রনের বাঁধাই চেয়ে দশ গুন শক্তিশালি, তাই ইলেক্ট্রন মুক্ত স্ফটিক কাঠামো ধ্বংস পরোক্ষভাবে প্রকাশ করা হয় না।

Leave a Reply